ল্যাপটপ পেয়ে উচ্ছসিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রোমান

সামাজের মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়া  বেদে সম্প্রদায়ের দরিদ্র রিকশা চালকের ছেলে রোমান মৃধা।  ৭ম শ্রেণিতে পড়াশোনা করার সময় বাবা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন । ৬ ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট রোমানের পড়াশোনা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কিশোর বয়সে নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা চালিয়ে যায়। সে গ্রামে টিউশনি করেছে। সেই সাথে মায়ের গাভী পালন ও কৃষি কাজের রোজগারের টাকায় ২০১৬ সালে এসএসসি পাস করে। কলেজে ভর্তির পর বাবা মারা যান। এরপর একাগ্রতা ও নিষ্ঠাকে যুগলবন্দী করে ২০১৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেড়িয়েছে । এখন তিনি  বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র।
রোমান ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোসিং উদ্যোক্তা হতে  গোপালগঞ্জে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি ল্যাপটপের জন্য আবেদন করেন। গতকাল বুধবার জেলা প্রশাসক কাজী মাহবুবুল আলম তার হাতে একটি ল্যাপটপ তুলে দেন। এটি পেয়ে রোমান উচ্ছসিত । তিনি ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোসিং এর আয় দিয়ে উচ্চ শিক্ষা সমাপ্ত করে সংসারের স্বাচ্ছলতা আনবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া তিনি স্মার্ট ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যায় ব্যক্ত করেছেন।
রোমান গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়নের দীঘাকূল গ্রামের মৃত দবির মৃধার ছেলে। মা ফুল জাহান বেগম (৬৫) গৃহিনী । বড় দু’ ভাই জুয়েল মৃধা ও খবির মৃধা পড়াশেনা করে নি। তারা হকারী করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তারা বিয়ে করে বাবা মায়ের সংসার থেকে বহু বছর  আগেই পৃথক হয়ে গেছেন। ৩ বোন সামান্য লেখাপড়া করেছেন। তাদের প্রত্যেকের বিয়ে হয়ে গেছে।
রোমান মৃধা বলেন,  আমি পিছিয়ে পড়া  বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ। আমি অনেক ঘাত প্রতিঘাত পেড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। উন্নয়নের মূল¯্রােত ধারায় সামিল হতে আমি  জেলা প্রশাসকের কাছে একটি ল্যাপটপ চেয়েছিলাম। এটি  প্রদান করে তিনি আমাকে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমি এ ল্যাপটপ দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোসিং এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জণ করতে পারব। বিশ্ববিদ্যালয়ের পওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন করব। বর্তমানে টিউশনির আয় ও মোরাল প্যারেন্টর্স পরিবারের ১ হাজার ৫০০ টাকার অনুদানে আমার পড়াশোনা চলছে। টিউশনি ছেড়ে দেব। ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোসিং এর অর্জিত  টাকায় আমার উচ্চ শিক্ষা সুন্দরভাবে সমাপ্ত হবে। এছাড়া বাড়তি আয় দিয়ে সংসারের দারিদ্রতা দূর করব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মার্ট বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা তাঁর স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের যোগ্য কারিগর হব। এ সহযোগিতার জন্য আমি জেলা প্রশাসকের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
জেলা প্রশাসক কাজী মাহবুবুল আলম বলেন, বেদে সম্প্রদায়ের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থী রোমান মৃধাকে এবি ব্যাংক পিএলসির পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের পক্ষ থেকেএকটি ল্যাপটপ প্রদান করেছি। কোন শ্রেণি পেশার মানুষকে বাদ দিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ করা যাবে না। তাই  সমাজের মূল ¯্রােতধারায় যুক্ত করতে রোমানকে ল্যাপটপ দিয়েছি। তথ্য ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সে সমৃদ্ধি পথে এগিয়ে যাবে। তারাই প্রধানমন্ত্রীর স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করবে। দেশ উন্নত ও সমৃদ্ধ হবে।
রোমানের মা ফুল জাহান বেগম (৬৫) বলেন, আমার ছেলে খুবই পরিশ্রমী। সে অনেক টাকা আয় করার জন্য আমার কাছে ল্যাপটপ চাইত। কিন্তু তাকে ল্যাপটপ কিনে দেওয়ার সামর্থ আমার নেই। জেলা প্রশাসক  তাকে ল্যাপটপ দিয়েছে। এখন সে ল্যাপটপ দিয়ে কাজ করে টাকা রোজগার করবে। এতে আমাদের দুঃখ ,দুর্দশা থাকবে না। আমরা ভাল থাকতে পাবর।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আরিফ হোসেন বলেন, ফ্রি ল্যান্সিং ও আউটসোসিং উদ্যোক্তা হতে  শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের কাছে ল্যাপটপ পেতে আবেদন করেন। জেলা প্রশাসক কাজী মাহাবুবুল আলম এবি ব্যাংক পিএলসির পৃষ্ঠপোষকতায় রোমানসহ জেলার ২০ জন দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীকে বছাই করেন। তিনি প্রত্যেককে ১টি করে ল্যাপটপ দিয়েছেন। স্মার্ট বাংলাদেশের কারিগর তৈরীতে ভবিষ্যতে জেলা প্রশাসনের এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। (বাসস)