ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেনতারা এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ভাইয়েরা প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছেন। জানাজা অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানিয়ে স্লোগান দেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের চলমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
খামেনির শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা স্থগিত রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজধানী তেহরানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের প্রকাশ্যে দেখা যাবে—এটি শুরুতে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। কারণ, যুদ্ধের শুরুতেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চালানো বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সী খামেনি, তার পরিবারের সদস্য এবং আরও কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন। এর আগে যুদ্ধ চলাকালে যেসব নেতাদের প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছেল, তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েল।
তবে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এখনও প্রকাশ্যে আসেননি। ধারণা করা হচ্ছে, যে বিমান হামলায় তার বাবাকে হত্যা করা হেয়েছিল, একই বিমান হামলায় তিনিও আহত হয়েছিলেন। তারপর থেকেই তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। ইসরায়েল তাকেও হত্যারও হুমকি দিয়েছে।
এসবের মধ্যেই তিনি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি তার নেতৃত্বাধীন শীর্ষ কর্মকর্তারা যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পদক্ষেপ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
জানাজায় অংশ নেওয়া ৪২ বছর বয়সী নার্স জিবা নাদেরি জানান, দেশের বিষয়ে মোজতবা খামেনি যা নির্দেশ দেবেন, ইরানের সেটিই অনুসরণ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিশোধের আহ্বান শুনেছি। কিন্তু আমাদের করণীয় কী, তা আমাদের নেতাই ঠিক করে দেবেন। আমরা তার নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য।’
জানাজায় দোয়া ও প্রতিশোধের আহ্বান
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় ৯৭ বছর বয়সী শিয়া আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি প্রয়াত খামেনি এবং তার পরিবারের নিহত সদস্যদের জানাজার নামাজে ইমামতি করেন।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন খামেনির ছেলে মাসউদ, মেইসাম ও মোস্তাফা। তাদের সবাইকে যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম প্রকাশ্যে দেখা গেছে। এছাড়া, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধান জেনারেল আহমদ বাহিদিকেও জনতার মধ্যে দেখা যায়।
যুদ্ধ শুরুর পর বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো তার ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সাংবাদিকরা তাকে কালো বেসবল ক্যাপ পরে সাধারণ পোশাকধারী নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে দেখতে পান।
এছাড়া ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতির মধ্যেই গ্র্যান্ড মোসাল্লাজুড়ে টাঙানো পোস্টার ও দেয়াললেখায় ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার আহ্বান জানানো হয়।
জানাজার অনুষ্ঠান শুরুর আগে সঞ্চালনার দায়িত্বে থাকা কবি মোহাম্মদ রাসুলি জনতার মধ্যে স্লোগান তোলেন, ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ ও ‘ইসরায়েলের মৃত্যু হোক’।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে রাসুলি ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য মানুষটি এখনও কেন বেঁচে আছে?’ এ কথা শুনে উপস্থিত জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে। এরপর রাসুলি যখন বলেন, ‘পৃথিবী এখন আর ট্রাম্পের জন্য নিরাপদ জায়গা নয়’, তখন জনতা আরও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। খামেনির জানাজার এই আয়োজনেই ইরানে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কেউ ট্রাম্পের প্রণনাশ নিয়ে সরাসরি হুমকি দিল।
জানাজায় ট্রাম্পবিরোধী হুমকি জোরালো
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে দেশটির প্রতিষ্ঠার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভাষণ দিচ্ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি বলেন, ‘আমরা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছি। ভেনেজুয়েলার দিকে তাকান, ইরানের দিকে তাকান। আমরা তাদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছি, তাদের সামরিক বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করেছি।’
রবিবারের জানাজায় আগের দিনের তুলনায় অনেক বেশি মানুষের সমাগম হয়। শোকাহত জনতা খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কালো পোশাক পরিধান করেছিলেন। এ সময় তাদের ব্যানার ও পতাকা বহন করতেও দেখা যায়। পাশাপাশি ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বানসংবলিত ব্যানারও দেখা যায়।
জানাজায় ২৯ বছর বয়সী মুদি দোকানের কর্মী গোলামরেজা সাবুনি জানান, ‘আমি এখানে এসেছি স্লোগান দিতে এবং প্রতিশোধ চাইতে। তারা আমাদের ইমামকে হত্যা করেছে। আমাদেরও তাদের নেতা ট্রাম্পকে হত্যা করা উচিত।’
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এরপর থেকেই ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইরানের সম্ভাব্য হুমকি পর্যবেক্ষণ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কর্তৃপক্ষ।
যদিও ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ইরান বারবারই অস্বীকার করে আসছে, তবে দেশটির কট্টরপন্থি প্রচারণামূলক বিভিন্ন ভিডিওতে দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পকে তাদের হত্যার নিশানায় দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্পও ইরানের পুরো সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত
খামেনির মরদেহ ইরানের বিভিন্ন শহর এবং প্রতিবেশী ইরাকে নেওয়া হবে। সোমবার তার ও নিহত অন্যান্যদের কফিন তেহরানের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করানো হবে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
দেশজুড়ে শোক পালনের কারণে সড়ক, আকাশপথ এবং স্বাভাবিক জনজীবনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার খামেনির মরদেহ তার জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজা মাজারে দাফন করা হবে। এর মধ্য দিয়ে শোক অনুষ্ঠান শেষ হবে।
তবে, শনি ও রবিবারের জানাজায় কত মানুষ অংশ নিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি ইরানের কর্তৃপক্ষ। ইরানে তেহরানের পাশাপাশি অন্যান্য শহরগুলোতেও শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এদিকে, যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনা খামেনির জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে। জানাজায় বিশাল এই জনসমাগম ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শান্তি আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের প্রভাবকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে দেশটি। এর মধ্যে ইসরায়েল আবারও ইরানে হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
জানাজায় শোকাহত মোহাম্মদ রেজা শরিফি জানান, আমাদের শহিদ নেতার রক্তের অসম্মান হয়, এমন যেকোনো পররাষ্ট্রনীতি আমাদের বর্জন করতে হবে। ইরানের কাছ থেকে কঠোর জবাব না পেলে অন্য দেশগুলো আবারো আমাদের ওপর হামলার সুযোগ পাবে।’