ইউক্রেন ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনে জি-৭ নেতাদের স্বাগত

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেলে। তিনি মস্কোর প্রতি আরও কঠোর মনোভাব নেওয়ায় জি-৭ নেতৃবৃন্দ তাকে স্বাগত জানিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অবস্থান পরিবর্তনের কারণে নতুন ধরণের ঐক্য গড়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন জি-৭ নেতারা।

ফ্রান্সের এভিয়ান শহরে তিন দিনের এই শীর্ষ সম্মেলনে মূল আলোচনার বিষয় ছিল ইরান যুদ্ধের অবসান নিয়ে ট্রাম্পের উদ্যোগ এবং ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাশিয়ার ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রচেষ্টা।

ফ্রান্সের এভিয়ান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ট্রাম্প একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন, যা তেহরানের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানের পথ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাপত্রেও একমত হন। এতে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গত বছরের সম্মেলনের সঙ্গে এর স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ওই সম্মেলন শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প চলে গিয়েছিলেন।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎস বলেন, ‘এটি কঠিন কাজ ছিল, কিন্তু ফলপ্রসূ হয়েছে।’

তিনি যৌথ বিবৃতিকে ‘সাফল্য’ বলে অভিহিত করেন।

ঘোষণাপত্রে বলা হয়, ইউক্রেনকে আরও আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের পাশাপাশি রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়ানো হবে। আর এজন্য মস্কোর জীবাশ্ম জ্বালানি আয়কে লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞাও জোরদার করা হবে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ইউক্রেন প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে ‘খুব গভীর পরিবর্তন’ এসেছে বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ট্রাম্প এখন বুঝতে পেরেছেন যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন শান্তি আলোচনায় আন্তরিক নন।
ম্যাখোঁ আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের সবার মতোই উপলব্ধি করেছেন যে বর্তমানে শান্তি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে রাশিয়ার কোনো গুরুতর আগ্রহ নেই।’

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেন, ইউক্রেন ইস্যুতে নেতাদের মধ্যে ‘উল্লেখযোগ্য মাত্রার ঐকমত্য’ ছিল এবং সেখানে ‘কোনো মতবিরোধ বা বিরোধিতা’ দেখা যায়নি।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকসহ পুরো সম্মেলনজুড়ে ট্রাম্প মস্কোর প্রতি আরও কঠোর অবস্থান নেন।

তিনি বলেন, রাশিয়াকে অবশ্যই একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে এবং যুদ্ধের দুই পক্ষের ক্রমবর্ধমান প্রাণহানিতে তিনি বিরক্ত।

একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, জি-৭ নেতারা ইউক্রেনভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়েও একমত হয়েছেন।

-কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা-

বুধবার মধ্যাহ্নভোজের বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই প্রযুক্তি ব্যবস্থায় শিশু-কিশোরদের সুরক্ষায় আরও নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নেয় কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ। এ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কিছুটা অস্বস্তির কারণ হয়েছে।

বৈঠকে অংশ নেন ওপেনএআই-এর প্রধান স্যাম অল্টম্যান, অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোদেই, গুগলের এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিপমাইন্ডের প্রতিষ্ঠাতা ডেমিস হাসাবিস এবং ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান মিস্ত্রাল এআই-এর আর্থার মেনশ।

যৌথ বিবৃতিতে জি-৭ নেতারা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, যাতে তারা নিরাপদ, সুরক্ষিত ও বয়স-উপযোগী ডিজিটাল অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও ব্যবস্থা তৈরি ও প্রয়োগ করে।

মাখোঁ এআই খাতে ‘আরও উন্নত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার’ আহ্বান জানান।

তিনি সতর্ক করে বলেন, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার অভাব বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অল্টম্যান নেতাদের উদ্দেশে বলেন, এআই-সংক্রান্ত দায়িত্ব প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে না।

-ভার্সাই প্রাসাদে ট্রাম্প-

সম্মেলনজুড়ে ট্রাম্পই ছিলেন সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি।

ফরাসি কর্মকর্তারা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন যে অনিশ্চিত ও অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তের জন্য পরিচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট পুরো সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এবং যৌথ ঘোষণাপত্রেও স্বাক্ষর করেছেন।

সম্মেলন শেষে মাখোঁ ট্রাম্পকে প্যারিসের বাইরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান, যা ছিল ব্যতিক্রমধর্মী একটি উদ্যোগ।

বুধবার সন্ধ্যায় ম্যাখোঁ ও তার স্ত্রী ব্রিজিত প্রাসাদে ট্রাম্পকে স্বাগত জানান। এর আগে ট্রাম্প রসিকতা করে বলেছিলেন, ভার্সাইয়ে ‘অনেক সোনা আছে, আমি সেটা দেখতে চাই।’

মাখোঁ ট্রাম্পের জন্য একটি ব্যক্তিগত ভ্রমণের আয়োজন করেন। এতে ছিল হল অব মিররস, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধবিষয়ক একটি গ্যালারি ও রয়্যাল চ্যাপেলে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান।

নিম্ন গ্যালারিতে মোমবাতির আলোয় আয়োজিত নৈশভোজে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।

এ সময় মাখোঁসহ উপস্থিত অতিথিরা করতালি দেন। ট্রাম্পের এক সহকারী প্রকাশিত ভিডিওতে এ দৃশ্য দেখা যায়।

নৈশভোজে প্রায় ৩০ জন অতিথি উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে বিলাসপণ্য প্রতিষ্ঠান এলভিএমএইচ-এর প্রধান বার্নার্ড আর্নো ওটোটাল এনার্জিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্যাট্রিক পুইয়ানে ছিলেন।